সৌভিক পোদ্দার, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি
১৩.০৩.২০২৬
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার উর্বর মাটিতে মাঠে মাঠে ধূসর সবুজ রংয়ের তামাক পাতা সারি দেখতে পাওয়া যায়।
এই দৃশ্য স্থানীয় কৃষকদের মনে একটি দ্বিধার জন্ম দেয়।
শৈলকুপার কৃষকরা বিশেষভাবে তামাক চাষের আকৃষ্ট হয়েছেন এবং এর পেছনে মূলত আর্থিক কারণটাই প্রাধান্য পায়।
তামাক চাষ থেকে প্রতিটি মৌসুমে তারা তুলনামূলকভাবে ভালো লাভ করতে পারে।
ধান বা সবজি চাষের তুলনায় তামাক বাজারে বিক্রি করা সহজ, চাহিদা স্থায়ী, এবং দামও স্থির থাকে। তাই অনেক চাষি তামাককে ‘লাভজনক ফসল’ হিসেবে বিবেচনা করে। তবে তামাক চাষের সুবিধা ও ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা চলতে থাকে।
ভালো দিকগুলো মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: প্রথমত, তামাক চাষ তুলনামূলকভাবে কম শ্রমসংক্রান্ত চাপের ফসল। ধান বা সবজি চাষে দিনে দিনে কৃষককে মাঠে অনেক সময় কাটাতে হয়, আবার তামাকের ক্ষেতেও নির্দিষ্ট কিছু সময় বাদে তুলনামূলক কম শ্রম লাগে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি আয় বাড়ায়। শৈলকুপার বাজারে তামাক বিক্রি করে কৃষকরা প্রায়ই ঋণমুক্ত থাকতে পারেন এবং মৌসুম শেষ হওয়ার সাথে সাথে তাদের হাতে নগদ অর্থ থাকে।
তৃতীয়ত, তামাক চাষ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে তারা অন্যান্য ফসলের বীজ, সার ও কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে সক্ষম হয়। অনেক চাষি বলেন, তামাক থাকলে ধান ও সবজি চাষে আমরা কম ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারি।
অন্যদিকে, তামাক চাষের ক্ষতিকর দিকগুলোও অস্পষ্ট নয়। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকি সবচেয়ে বড় একটি উদ্বেগ। তামাক পাতা সংগ্রহ বা প্রক্রিয়াকরণের সময় সরাসরি স্পর্শ করলে তামাকে জোনে থাকা নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করে, যা তামাক শ্রমিকদের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। অনেক চাষি শৈলকুপা ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে দেখা গেছে, তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের মধ্যে চর্মরোগ, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এছাড়াও, মাটির পুষ্টি চক্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। তামাক চাষের জন্য মাটিকে অনেক সার ও রাসায়নিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হয়, যা একদিকে মাটির উর্বরতা বজায় রাখে না, অন্যদিকে ভবিষ্যতে অন্যান্য ফসলের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশগত দিক থেকেও এটি একটি সমস্যা। শৈলকুপার গ্রামের কৃষকরা জানান, তামাক চাষের কারণে মাটির ওপর রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে, যা পানির উৎস এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করছে।
এছাড়া, তামাকের পাতা শুকানোর জন্য খোলা মাঠে বা কক্ষের ভিতরে আগুন জ্বালানো হয়, যার ফলে পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ এলাকায় বায়ু ও ধোঁয়ার কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়েছে এমন তথ্যও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়।
শৈলকুপার চাষিরা তবুও এই ফসলের দিকে ঝুঁকছে। এর কারণ কেবল আর্থিক লাভ নয়, বরং সামাজিক ও ঐতিহ্যগত দিকও আছে। তামাক চাষ এখানে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে, এবং স্থানীয় বাজার, বেচাকেনার চেন ও পরিচিতি এই ফসলকে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অনেক চাষি মনে করেন, যতক্ষণ তামাক বিক্রি হবে, ততক্ষণ আমাদের পরিবার স্বাবলম্বী থাকবে। অর্থাৎ, সামাজিক নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরতার অনুভূতিও তাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংস্থা তামাক চাষকে নিয়ন্ত্রণ করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা চাষিদের সতর্ক করছে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে, হাতে গ্লাভস, মুখমুখো ও অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে।
তাছাড়া, মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে ফসল ঘুরে চাষের উপদেশ দিচ্ছে। স্থানীয় এনজিও ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরও অন্যান্য বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করছে যাতে তামাকের উপর নির্ভরতা কমানো যায়।
শৈলকুপার কৃষকরা এই পরিস্থিতি বুঝেও চাষ ছাড়তে চাইছে না। কারণ, অন্য ফসল চাষে তারা তুলনামূলকভাবে কম মুনাফা পায়, আর জীবনধারার খরচে প্রতিকূলতা থাকে।
তারা বলছে, আমরা চাই আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা হোক, কিন্তু একবার তামাক ছাড়লে যআর্থিক নিরাপত্তা হারাতে হবে। তাই শৈলকুপার মাঠে মাঠে তামাকের পাতার সারি দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে কৃষকরা সতর্কভাবে স্বাস্থ্য রক্ষা ও আর্থিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চেষ্টা করছেন।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, শৈলকুপার তামাক চাষের পেছনে প্রধানত আর্থিক প্রলোভন, সামাজিক অভ্যাস এবং বাজারের স্থায়িত্বের কারণে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ। তদুপরি, স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও পরিবেশগত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তারা এই ফসলকে বেছে নিচ্ছে। এটি একটি দ্বন্দ্বপূর্ণ পরিস্থিতি যেখানে অর্থনৈতিক লাভ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি, ঐতিহ্য ও আধুনিক সচেতনতা একসাথে কাজ করছে।
ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, বিকল্প ফসলের প্রচার এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করলে শৈলকুপার কৃষকরা এই দ্বন্দ্বে আরও সুষ্ঠুভাবে সমাধান করতে পারবে।
সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়া
mounata01@gmail.com