মোঃ আমিরুল হক, জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ী:
পরিশ্রমী আত্মপ্রত্যয়ী মোঃ শাহজাহান রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের আওতায় ইসলামপুর ইউনিয়নের শ্রীরামকান্দী গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষক। প্রায় ২০ বছর ধরে কৃষির সঠিক দিকনির্দেশনা আর কৃষির উন্নত প্রযুক্তিগুলো শ্রীরামকান্দীর উর্বরা মাটিতে সম্প্রসারিত করে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে পেয়েছেন ব্যাপক সাফল্য। ইতোমধ্যে কৃষি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ তার মাঠভিত্তিক কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। থেমে নেই তার নতুন বিপ্লবের অগ্রযাত্রা। পারিবারিক দায়িত্ব পালনে নেই কোনো অবহেলা, নেই কৃষি বিভাগের কোনো নির্দেশ পালনে কার্পণ্যতা। সার্বক্ষণিক চিন্তা কৃষি-কৃষক ও কৃষি উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকা। তার প্রবল ইচ্ছা কৃষকের পেঁয়াজ বীজের দুষ্প্রাপ্যতা ও ব্যাপক কল্পে অর্থ উপার্জনের পথে তাকে সম্পৃক্ত করে তোলে। পাশাপাশি সৎ উপায়ে জীবন-জীবিকার পথ অন্বেষণে স্বাবলম্বী হওয়া। কথা হচ্ছিল এমন একজন প্রান্তিক পর্যায়েট কৃষকের সাথে।
পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ আপনি কেন এবং কিভাবে নিলেন ? এর জবাবে শাহজাহান মোল্লা বলেন, মা মাটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। গ্রামাঞ্চলের মাটি, সোনার চেয়ে খাঁটি। গ্রামের সহজ সরল কৃষক-কৃষাণীরা অক্লান্ত পরিশ্রমে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে ফসল উৎপাদন করলেও সফলতা অর্জন করতে পারে না, শুধুমাত্র ভিত্তি বা প্রত্যয়িত বীজের অভাবে। তখন থেকেই চিন্তা ভালোমানের বীজ উৎপাদন করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা, এতে সকল কৃষক উপকৃত হবে পাশাপাশি নিজেরও আর্থিক সচ্ছলতা আসবে। সরকারি পেঁয়াজ বীজের স্বল্পতা, বিশ্বস্ত বীজ বিক্রয় কেন্দ্রের কেনা বীজে বেশির ভাগ কৃষকই প্রতারিত হয়ে থাকেন। এসব বিবেচনায় প্রথমে ১০ শতাংশ পরে প্রায় ১ বিঘা জমিতে নিজেই পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন শুরু করি। উৎপাদিত বীজ থেকে স্থানীয় কিছু কৃষকের চাহিদা মিটিয়ে ব্যয় বাদে আনুমানিক প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ করি। সেই থেকে শুরু হলো সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অলস সময়ে অর্থ উপার্জনের টার্নিং পয়েন্ট সৃষ্টি। এরপর থেকে প্রতি বছর খরচ-খরচা বাদে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা উপার্জন করে আসছি।
চলতি বছরে কতটুকু বীজ উৎপাদন করেছেন এবং কতজন কৃষককে এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেছেন? জবাবে তিনি জানান, শ্রীরামকান্দি মাঠে গত বছর যেখানে মাত্র ৪-৫ পাখি জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন হয়েছিল। এবার কিন্তু প্রায় ১৫ থেকে ২০ পাখি জমিতে কৃষকেরা পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত বছর আমি নিজে ৪ পাখি জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করে আয়-ব্যয় বাদে প্রায় ২ লাখ টাকা উপার্জন করি। চলতি বছরে ৬ পাখির কিছু বেশি জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন ব্যবস্থা করেছি। আমাকে দেখে এবার এলাকায় বেশ কয়েকজন কৃষক আগ্রহী হয়ে বীজ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করি আমার মতো তারাও বেশ লাভবান হবেন।
শহিদুল, বাতেন, আশরাফুল, আব্দুস সালাম, বাবু বিশ্বাস, বাদশা মিয়া, জিল্লু খান, মুর্শেদ, নাসিম, আব্দুল হাকিম, লালন সরদারসহ এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন আদর্শ পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনকারী কৃষককে বীজ উৎপাদনের কলাকৌশল সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রশিক্ষণ প্রদানের ফলে এবার উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে কৃষকেরা পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করছে। এদিক থেকে এটা একটা বিরাট সাফল্য বলে আমি মনে করি।
চাষি শাহজাহান মোল্লা জানান, এ পর্যন্ত তার ৬ পাখির কিছু বেশি জমিতে বীজ খরচ ২ লাখ টাকা, চাষ, সেচ, লেবার ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ আরও ৪ লাখ টাকা সর্বমোট ৬ লাখ টাকা খরচ হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাখিপ্রতি ৬৫ থেকে ৭০ কেজি বীজ পাওয়া যাবে। গড়ে পাখিপ্রতি ৬৫ কেজি মানসম্মত বীজ পেলে এবং প্রতি কেজি গড়ে ২০০০ টাকা দরে বিক্রি হলে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পাওয়া যাবে, যা খরচ বাদে তার ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কৃষক শাহজাহান মোল্লাকে শুধু ব্লকের কৃষকেরাই চিনে তা নয়, জেলা উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের কৃষকেরা পেঁয়াজ শাহজাহান হিসেবে তাকে চিনে। সে প্রতি বছর ৩-৪ লাখ টাকা আয় করে থাকে। মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন শাহজাহান মোল্লা। পরিশ্রমই সৌভাগ্যের সোপান, শ্রম কখনও বিফলে যায় না। মেধা, শ্রম ও কৃষির উন্নত প্রযুক্তিকে সতর্কতার সাথে কাজে লাগিয়ে অনায়াসে যে কেউ শাহজাহান মোল্লার মতো বীজ শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি সচ্ছলভাবে জীবন-জীবিকার পথে অগ্রসর হতে পারবেন।
এবিষয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রতন কুমার ঘোষ বলেন, পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য পানি সেচ সুবিধা আলো-বাতাস ঠিকমতো থাকে এরকম উর্বর দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি নির্বাচন করে কমপক্ষে ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করে নিতে হয়। জমি প্রস্তুত করার সময় পর্যাপ্ত পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ও শেষ চাষে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া সার ৩৫ কেজি, টিএসপি সার ২৭ কেজি, এমওপি সার ২০ কেজি, জিপসাম সার ১ কেজি, বোরন সার ২ কেজি ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়।
বীজ হিসেবে পেঁয়াজ বিঘাপ্রতি ৫-৬ মণ বীজ লাগে। (মণপ্রতি হাইব্রিড কিং জাতের বীজেরমূল্য ৩০০০ ও বিপ্লব কিং বীজের মূল্য ৩৫০০ টাকা। ৬ পাখি জমিতে দুই জাতের বীজ লাগে মোট ৫০ মণ যার মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।
পুরো নভেম্বর মাস বীজ উৎপাদনের জন্য পেঁয়াজ রোপণের উপযুক্ত সময়। জমির আকার অনুসারে প্লট করে প্রতি প্লটে ৩-৪টি সারি বা লাইন করে নিতে হয়। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার. বা ১০ ইঞ্চি। প্রতি সারিতে ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার. বা ৬-৮ ইঞ্চি দূরে দূরে (মাতৃবাল্ব) বীজ বা কন্দ রোপণ করতে হয়। বীজ রোপণের ৩০ দিন পর প্রতি বিঘায় ১ম দফায় ৬০ কেজি ইউরিয়া ও ২০ কেজি এমওপি সার একত্রে এবং ৬০ দিন পর ২০ কেজি ইউরিয়া ও ১০ কেজি এমওপি সার একত্রে প্রয়োগ করতে হয়। প্রয়োজনে হালকাভাবে পানি সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করবে।
পেঁয়াজের জীবন চক্র যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য ঘন ঘন ক্ষেত পরিদর্শন করে দুর্বল ও রোগাক্রান্ত গাছগুলো উঠিয়ে ফেলতে হয়। ছত্রাকজনিত পাপল ব্লচ রোগ দমনে ১০-১২ দিন পর পর রোভরাল রিডোমিল এম জেড-৭২ একত্রে স্প্রে করে দিতে হয়। বীজ (বাল্ব) রোপণ থেকে বীজ সংগ্রহ পর্যন্ত ১৬৫ থেকে ১৭০ দিন সময় লাগে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে নিতে আমাদের কৃষি বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, কৃষি বিপনন বিভাগ, বীজ প্রত্যায়ন বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ সবসময় মাঠে মাঠে গিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদেরকে পরামর্শ দেয়াসহ হাতে কলমে চাষাবাদ শিক্ষা দিয়ে থাকে। সেই সাথে কৃষকের জন্য আমাদের অফিসের দ্বার সবসময় খোলা। যাতে তারা সবসময় তাদের কৃষি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে।

