মো: হাসান আলী, বাঘাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন রাঙামাটি-২৯৯ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর আগে একই দিন সকাল ১০:৩০টায় তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল মর্যাদাপূর্ণ ও উৎসবমুখর। এসময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় দীপেন দেওয়ানের অন্তর্ভুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখার অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন (চট্টগ্রাম ৫) আসনের নব-নির্বাচিত সাংসদ তরুণ রাজনৈতিক নেতা মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। পাহাড়ের উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটন শিল্পের প্রসারে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা।
বর্ণিল ও সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন
রাঙামাটির একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান দীপেন দেওয়ান পেশাগত জীবন শুরু করেন বিচারক হিসেবে। পরবর্তীতে জনসেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে বিচার বিভাগীয় চাকরি ত্যাগ করে আইন পেশা ও সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন।
তিনি রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাহাড়ে দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও আদর্শিক শিক্ষাই তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় প্রেরণা জুগিয়েছে বলে ঘনিষ্ঠজনরা মনে করেন।
এডভোকেট দীপেন দেওয়ান সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার সময় নানান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হলে যে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন, সেগুলো হলো, পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান জোরদার। দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান, দুর্গম এলাকায় সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন। পর্যটন শিল্পকে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
স্থানীয় যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
তিনি বলেন, “পাহাড়ে কোনো বিভাজন নয়, ঐক্যই হবে আমাদের শক্তি। সব জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে চাই।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় তাঁর নিয়োগকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী মহল এবং সাধারণ জনগণ আশা করছেন, পাহাড়ের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা কাটিয়ে নতুন যুগের সূচনা হবে।
বিশেষ করে পর্যটন সম্ভাবনাময় সাজেক, কাপ্তাই ও নীলগিরি এলাকায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন।
এডভোকেট দীপেন দেওয়ান পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় বাঘাইছড়ি উপজেলার স্থানীয় বিএনপি নেতা–কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি সাংসদ হওয়ার পর থেকেই নেতা–কর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা ছিল যে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন। অবশেষে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ায় তাদের মাঝে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আশা প্রকাশ করেছেন, পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এডভোকেট দীপেন দেওয়ান রাঙামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জনগণের দীর্ঘদিনের চাওয়া–পাওয়া বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দায়িত্ব গ্রহণকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। এখন দেখার বিষয়—নতুন মন্ত্রীর নেতৃত্বে পাহাড় কত দ্রুত স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।

