মোঃ আমিরুল হক,জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ী:
দুই শিশুর মরদেহ পাশাপাশি রাখা। সেখানে লোকে লোকারণ্য। শরীফুল সন্তানের কাছে বসে কান্না করছেন। শরিফুলের স্ত্রী শাকিলা শোকে নির্বাক। মাঝে মধ্যে বিলাপ করছেন ছেলের জন্য। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর মেয়ে হারানো নিশি অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছেন। যেন কাঁদতে কাঁদতে চোঁখের পানি শুকিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে তিনিও মূর্ছা যাচ্ছেন।
ঈদের ছুটিতে গার্মেন্সকর্মী নিশি বাবার বাড়ি বেড়াতে আসেন। ঢাকায় ঘুরতে যাওয়ার শখ ছিল তার ভাবী শাকিলার। তাই ছুটি শেষে শাকিলা, তার ছেলে সাবিত, মেয়ে সাবিহা, ননদ নিশি ও নিশির একমাত্র মেয়ে সোহানাকে নিয়ে রাজবাড়ী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে রওনা হন। দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরি ঘাটে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কিন্তু কে জানত এ যাত্রাই হবে তার সন্তান ও ভাতিজির শেষ যাত্রা। এই দুর্ঘটনায় শাকিলার ছেলে সাবিতের (৮) ও ননদের মেয়ে সোহানা (১০) প্রাণ হারিয়েছে। বেঁচে ফিরেছেন শাকিলার মেয়ে সাবিহা ও ননদ নিশি।
প্রতিবেশী আলেয়া বেগম, সুমন বলেন, শরিফুলের বোন নিশি আক্তার ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করেন। তার স্বামী ও একমাত্র সন্তান সোহানাকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ঈদের ছুটিতে নিশি এসেছিলেন বাবার বাড়ি বেড়াতে। ছুটি শেষে গত বুধবার বিকেলে ভাবী, ভাতিজা আর ভাতিজিকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
তারা বলেন, দৌলতদিয়ায় পন্টুন থেকে বাসটি পদ্মায় পড়ে যাওয়ার পর শাকিলা এক হাতে মেয়েকে নিয়ে অন্য হাতে সাঁতরে পল্টুনের কাছে আসেন চলে আসেন। দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে বলেন, ভাই আমার মেয়েটাকে ধরেন, আমি বাস থেকে ছেলেকে নিয়ে আসি। তখন পল্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মেয়ের সঙ্গে মাকেও টেনে পল্টুনের উপরে তুলে নিয়ে আসেন। কারণ তারা বুঝেছিলেন শাকিলা ছেলেকে আনতে গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না। পল্টুনে তোলার পরপরই অজান হয়ে যান শাকিলা।
এলাকাবাসী বলেন, শাকিলা বেগম দাদশী ইউনিয়নের আগমাড়াই গ্রামের শরিফুল ইসলামের স্ত্রী। শরিফুল পেশায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। সাবিত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়তো। বৃহস্পতিবার দুপুরে আগমারাই গ্রামে শরিফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ীর উঠানে দু’টি অবুঝ শিশুর নিথর দেহ পড়ে আছে। চারপাশে শত শত নারী-পুরুষ জড়ো হয়ে আছে। সবার চোঁখে মুখে শোকের ছায়া। শোকে যেন বাড়ীর বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম বলেন, একটা সুখী পরিবারে এমন কালো ছায়া নেমে আসবে কল্পনাও করেনি কেউ। এরকম আর কোন পরিবারে যেন না হয়।

