মোঃ আবুল কালাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর উপজেলা প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার মোট ২১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। মাত্র ৩-৪ জন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও, তাকে দাপ্তরিক কাজেই অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত দাপ্তরিক ফাইলপত্র ও মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এতে তারা ক্লাসে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ায় সহকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নির্দেশনা না মানার প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে, যা শিক্ষা পরিবেশকে নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শ্যামগ্রাম দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন:
”আমাদের বিদ্যালয়ে ২০২১ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। ২০২৫ সালে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে সময় দেওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে।”
অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। কুড়িনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মো. সোহেল রানা জানান, একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে এবং শিক্ষার মান দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষক নেতা ও আলিয়াবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম সবুজ বলেন, প্রধান শিক্ষক হলেন একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্তম্ভ। দীর্ঘদিন এই পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বেই। তিনি দ্রুত সকল স্কুলে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান।
একই সুর শোনা যায় শ্যামগ্রাম (দ.) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. রোস্তম আহাম্মদ-এর কণ্ঠে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২১ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মান নাজুক হয়ে পড়েছে; দ্রুত নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উম্মে সালমা জানান:
”প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি এবং প্রতি মাসে হালনাগাদ তথ্য পাঠানো হচ্ছে। পদোন্নতির যোগ্য শিক্ষকদের তালিকাও পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এই শূন্যপদগুলো পূরণ হবে।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট দ্রুত সমাধান করা জরুরি। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও বুনিয়াদি শিক্ষার ওপর।

