ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন বিচার
  4. আন্তর্জাতিক
  5. ক্যাম্পাস
  6. খেলাধুলা
  7. গণমাধ্যম
  8. জনপ্রিয় সংবাদ
  9. জাতীয়
  10. বিনোদন
  11. রাজধানী
  12. রাজনীতি
  13. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কৌশলগত প্রজ্ঞা বনাম অবস্থানগত বিভ্রান্তি: এম এ হাশেম রাজুর নেতৃত্বে কর্ণেল অলির রাজনৈতিক বলয়ের চন্দ পতন

admin
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬ ১০:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

নুরুল আবছার নূরী

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জনন্দিত ও প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব কর্ণেল অলি আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অভিজ্ঞতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কৌশলগত ভুল, সময়োচিত সিদ্ধান্তে ব্যর্থতা এবং অবস্থানগত দ্বিধা। মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বারবার ভুল জোট, বিতর্কিত সমঝোতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়ের ওপর নির্ভরশীলতা তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
এর বিপরীতে এম এ হাশেম রাজু দেখিয়েছেন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও কৌশলগত দূরদর্শিতা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া বিএনপির শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠননির্ভর রাজনীতির ধারাকে সামনে রেখে তিনি ব্যক্তিগত নমিনেশন ত্যাগ করে জসিম উদ্দিনের মতো তুলনামূলক আগুন্তক প্রার্থীকে বিজয়ের মঞ্চে দাঁড় করিয়েছেন।
এই নির্বাচনে জসিম উদ্দিনের জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ছিল সুচিন্তিত কৌশল, সংগঠন পুনর্গঠন এবং তৃণমূল সমন্বয়ের ফল। আর সেই যাদুর খেলার প্রধান কারিগর এম এ হাশেম রাজু।
তাঁর এই সাফল্য, রাজনৈতিক সংযম ও কৌশলগত নেতৃত্ব নিয়েই আমি কিছু কথা লিখতে বসলাম।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলকে যদি কেবল একটি আসনের বিজয়-পরাজয়ের নিরিখে বিচার করা হয়, তবে ইতিহাসের গভীরতর স্তর অদৃশ্য থেকে যাবে। বাস্তবে এটি ছিল দুই ধারার রাজনীতির মুখোমুখি অবস্থান—একদিকে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাববলয়, অন্যদিকে সংগঠননির্ভর, কৌশলগত ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে ছিলেন এম এ হাশেম রাজু এবং কর্ণেল অলি আহমেদ।
এই নির্বাচনে এম এ হাশেম রাজুর ভূমিকা ছিল নীরব কিন্তু নির্ণায়ক। তিনি প্রার্থী ছিলেন না, কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণের প্রধান রূপকার ছিলেন। নিজের নমিনেশন পরিহার করে জাসিম উদ্দিনের পক্ষে প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান সময়ের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।
কৌশলগত আত্মসংযম: ব্যক্তির ঊর্ধ্বে দল
দলীয় রাজনীতিতে নমিনেশন প্রশ্নে আপস না করা কিংবা নিজের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানো সাধারণত দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এম এ হাশেম রাজুর সিদ্ধান্ত ছিল কৌশলগত আত্মসংযমের প্রতিফলন। তিনি বুঝেছিলেন—বিভক্ত শক্তি নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামা মানে প্রতিপক্ষকে সুবিধা দেওয়া। ফলে তিনি ব্যক্তিগত সম্ভাবনাকে পেছনে রেখে একটি সমন্বিত নির্বাচনী কাঠামো নির্মাণে মনোনিবেশ করেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দর্শন—সংগঠন, শৃঙ্খলা ও ত্যাগ—এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পুনরায় প্রতিফলিত হয়েছে। রাজু দেখিয়েছেন, আদর্শভিত্তিক রাজনীতি কেবল বক্তৃতায় নয়, বাস্তব কৌশলেও প্রমাণিত হতে হয়।
কর্ণেল অলি আহমেদের রাজনৈতিক বলয়ের ভাঙন
কর্ণেল অলি আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ও ব্যক্তিগত প্রভাববলয়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনীতির চরিত্র বদলায়। জনমানস এখন ব্যক্তির চেয়ে কাঠামো, আবেগের চেয়ে ফলাফল, পরিচয়ের চেয়ে অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।
এই নির্বাচনে এম এ হাশেম রাজু যে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, তৃণমূল সক্রিয়করণ এবং ভোট-সমীকরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন করেছেন, তা কার্যত কর্ণেল অলির দীর্ঘদিনের বলয়কে অকার্যকর করে দেয়। জাসিম উদ্দিনের বিজয় ছিল সেই সুপরিকল্পিত সাংগঠনিক প্রয়াসের ফল।
এটি ছিল সরাসরি সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং রাজনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার উদাহরণ। কর্ণেল অলির রাজনীতির যে ঐতিহাসিক অবস্থান ছিল, তা এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কার্যত পুনর্মূল্যায়নের মুখে পড়ে।
মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক প্রশ্ন ও রাজনৈতিক অবস্থান
একজন মুক্তিযোদ্ধার রাজনৈতিক অবস্থান যখন স্বাধীনতার চেতনার প্রশ্নে বিতর্কিত হয়, তখন তা শুধু দলীয় ইস্যু থাকে না—তা হয়ে ওঠে নৈতিক প্রশ্ন। এম এ হাশেম রাজু এই নৈতিক বিতর্কের জবাব দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে নয়, বরং গণরায়ের মাধ্যমে।
তিনি তাঁর মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে একটি প্রতীকী বার্তা দিয়েছেন—মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় ব্যক্তিগত ঢাল হতে পারে না; রাজনৈতিক অবস্থানই শেষ পর্যন্ত জনসমর্থনের ভিত্তি নির্ধারণ করে।
হামলা, অভিযোগ ও প্রশাসনিক নীরবতা
নির্বাচনের প্রাক্কালে এম এ হাশেম রাজুকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হামলার অভিযোগ ওঠে। সাতকানিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলেও রহস্যজনকভাবে মামলা রেকর্ড না হওয়া রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই প্রশাসনিক নীরবতা প্রশ্নের জন্ম দেয়—নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমতা ও ন্যায়বিচারের অবস্থান কোথায়?
কিন্তু এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজু কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে যাননি। তিনি পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পথ এড়িয়ে সংগঠনকে আরও সংহত করেছেন। এতে প্রমাণিত হয়েছে তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের রাজনীতি করেন না; তিনি দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের রাজনীতি করেন।
এক নিবেদিত রাজনৈতিক স্থপতি
এম এ হাশেম রাজুর রাজনৈতিক শক্তি তাঁর বক্তৃতায় নয়, তাঁর সংগঠনে। তিনি কর্মী তৈরি করেন, কাঠামো নির্মাণ করেন, বিভক্ত শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। এই নির্বাচনে তাঁর ভূমিকা দেখিয়েছে—আধুনিক রাজনীতি কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তিনি প্রমাণ করেছেন—
নেতৃত্ব মানে ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়;
কৌশল মানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা;
বিজয় মানে সংগঠনের সমষ্টিগত সাফল্য।
চট্টগ্রামের এই নির্বাচনের ইতিহাসে প্রার্থীদের নাম দৃশ্যমান থাকবে, কিন্তু অন্তরালের অধ্যায়ে এম এ হাশেম রাজুর নাম উচ্চারিত হবে একজন কৌশলী সংগঠক ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক সৈনিক হিসেবে। কর্ণেল অলি আহমেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বলয়কে ভেঙে নতুন সমীকরণ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তিনি নমিনেশন ত্যাগ করেছেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করেননি।
তিনি সামনে আসেননি, কিন্তু ফল নির্ধারণ করেছেন।
তিনি প্রমাণ করেছেন—দলনিষ্ঠ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কৌশলগত রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
এম এ হাশেম রাজু—একজন নিবেদিত পুরুষ, যিনি ব্যক্তি-প্রাধান্যের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সংগঠননির্ভর রাজনীতির নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন।