এসএম নুর ইসলাম
৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বগুড়া-৬ এবং শেরপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বগুড়া-৬ আসনটি শূন্য হয় একজন প্রার্থী একাধিক আসনে নির্বাচিত হয়ে আইন অনুযায়ী একটি আসন ত্যাগ করার ফলে। শেরপুর-৩ আসনে পূর্ববর্তী নির্বাচনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন বাতিল হওয়ায় পুনরায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
এই উপ-নির্বাচনে রুপসা ৪০ জন প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ নাগরিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে, যারা উভয় আসনের ১৭০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের শুরু, ভোটদান এবং গণনা প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলকতা মূল্যায়নের ওপর, বিশেষ করে জাতিগত, ধর্মীয় এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে। এই কার্যক্রম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুসরণ করে এবং রুপসার বৃহত্তর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে পরিচালিত হয় ।
উপনির্বাচনটি সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতিতে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। সকালে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও দিনের পরবর্তী সময়ে কিছু কেন্দ্রে তা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন এলাকায় ভোটার অংশগ্রহণে পার্থক্য দেখা যায়-কিছু স্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেলেও অন্যত্র তুলনামূলকভাবে কম উপস্থিতি ছিল, যা প্রবেশযোগ্যতা, নির্বাচন পরিচালনার প্রতি আস্থা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
ভোটকেন্দ্রে ভোট কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বিঘ্ন ছিল এবং অধিকাংশ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে ও নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করে। সকল পর্যবেক্ষণকৃত কেন্দ্রে রুপসার পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়, যা পর্যবেক্ষক প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের উন্নত ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। নির্বাচন কর্মকর্তারা সন্তোষজনক প্রস্তুতি প্রদর্শন করেন। পর্যবেক্ষিত সকল কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় নির্বাচন সামগ্রী উপস্থিত ছিল এবং ৭০টির মধ্যে ৬৫টি ক্ষেত্রে ব্যালট বাক্স সিল করার আগে তা খালি অবস্থায় প্রদর্শন করা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভোটার তথ্য প্রদর্শনে সামান্য অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।
ভোটগ্রহণ চলাকালীন সময়ে পরিবেশ সাধারণত শান্ত ও সুশৃঙ্খল ছিল। তবে শেরপুর-৩ আসনে কিছু নির্বাচনী অনিয়মের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়। চাক্কাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শ্রীবরদী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট প্রদানের ঘটনা শনাক্ত হয়, যেখানে প্রতারণামূলকভাবে ভোট প্রদানের অভিযোগে ছয়জনকে পুলিশ আটক করে। এসব ঘটনা নির্বাচনী স্বচ্ছতা রক্ষায় অধিক সতর্কতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্র বন্ধের প্রক্রিয়া সাধারণত সুশৃঙ্খল ছিল এবং নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত সকল ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে গণনা প্রক্রিয়ায় কিছু কেন্দ্রে বৈধ ও অবৈধ ভোট যথাযথভাবে পৃথক ও গণনা করা হয়নি, যা প্রক্রিয়াগত ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। রুপসার পর্যবেক্ষকরা ১৪টি ক্ষেত্রে ব্যালট নিয়ে বিরোধ বা বাতিলের ঘটনা লক্ষ্য করেন, তবে সবক্ষেত্রেই যথাযথভাবে কারণ ব্যাখ্যা করা হয় এবং নিয়ম অনুসরণ করা হয়। তবে ফলাফল লিপিবদ্ধকরণ ও প্রকাশ প্রক্রিয়া সন্তোষজনক ছিল না। পর্যবেক্ষিত ৫৭টি গণনা প্রক্রিয়ার মধ্যে ৩০টি ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফলাফল লিপিবদ্ধ ও প্রকাশ করা হয়নি এবং ৬টি ক্ষেত্রে আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে গণনা প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলেও ৫৬টির মধ্যে ৫টি কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়নি, যা স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। শেরপুর-৩ আসনে কিছু কেন্দ্রে সব দলের এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে যে একটি প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং সেখানে প্রতারণামূলক ভোট প্রদান ও প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রের বাইরের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল, যেখানে ৯০ শতাংশ কেন্দ্রকে শান্ত ও সুশৃঙ্খল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ৯ শতাংশ কেন্দ্রে উত্তেজনাপূর্ণ কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিস্থিতি ছিল। ১৬ শতাংশ কেন্দ্রের প্রবেশমুখে প্রচারণা সামগ্রী দেখা গেছে, যা নির্বাচনী বিধিমালার পরিপন্থী। কিছু স্থানে ভোটকেন্দ্রের বাইরে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ৮ শতাংশ কেন্দ্রে দলীয় এজেন্টদের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেছে, যা ভোটারদের স্বাধীনভাবে প্রদানের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক।
সংখ্যালঘু ভোটারদের অধিকাংশই দিনব্যাপী কোনো বাধা ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছেন। প্রায় সব কেন্দ্রে তারা ভয়ভীতি ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পেরেছেন এবং ভোট দিতে সক্ষম হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদের আচরণে বৈষম্যের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি এবং সংখ্যালঘু নারীরা নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে ভোট দিতে পেরেছেন। সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোটার যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হননি এবং লাইনে অপেক্ষার সময় তাদের নিরুৎসাহিত বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সাধারণত নিরপেক্ষ ও সুরক্ষামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটদান প্রক্রিয়া বোঝার জন্য দলীয় এজেন্ট বা অন্যদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
সুপারিশ
রুপসা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ প্রদান করছে:
• প্রতারণামূলক ভোটসহ নির্বাচনী অনিযয়ম প্রতিরোধে তদারকি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করা
• নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা
• বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধি করা
• ভোটকেন্দ্রসমূহে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অভিন্ন প্রয়োগ নিশ্চিত করা
রুপসার মুখপাত্র মি. হিরণ্ময় মণ্ডল বলেন,
“উপনির্বাচনটি সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ হলেও অনিয়মের ঘটনাগুলো পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী সততা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ এবং জনআস্থা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের কেন্দ্রে থাকতে হবে।”
পরবর্তী কার্যক্রম
১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এবং ৯ এপ্রিল উপনির্বাচন পর্যবেক্ষণের পর রুপসা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া জোরদারে কাজ অব্যাহত রাখবে। রুপসা ইতোমধ্যে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ২৫টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সম্পন্ন করেছে এবং ছয়টি বিভাগীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণের ফলাফল যাচাইকরণ সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জুন ২০২৬-এ একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

